ডাকবাক্সের খোঁজে

 ডাকবাক্সের খোঁজে

আমাদের এই কাঠখোট্টা ডিজিটাল জীবনে প্রতিদিন কত কী হারিয়ে ফেলছি তা হয়ত জানি না। হঠাৎ করে একদিন আক্ষেপ করব যে "আমাদের শেষ মেঠোপথটিও পাকা হয়ে গেল"। ডাকবক্স দেখি না কতদিন! নাকি দেখি; প্রয়োজন পড়ে না বলে হয়ত খেয়াল করা হয় না। মানুষের খেয়ালটাও সম্ভবত প্রয়োজন-নির্ভর। তাই তো দেখি "রাক্ষস গিলে নেয় এই মাটিও"। এই রাক্ষস কে?


গঙ্গাতীরবর্তী কলকাতা কিংবা ইরাবতীর রেঙ্গুন রবীন্দ্রনাথ যেমন বলেছেন গিলে ফেলেছে বাণিজ্য-দৈত্য, এই রাক্ষসও হয়ত সেই। কীভাবে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের ছেলেবেলার "বিল ঝিল, যে জলে পুকুর আস্ত আকাশ গেলে"– আমরা খোঁজ রাখতে ভুলে গেছি। বিমান ধর তাঁর "ডাকবাক্সের খোঁজে" কাব্যে তুলে এনেছে এমন অসংখ্য শিল্পবিপ্লবের কাছে হার মেনে যাওয়া প্রকৃত শিল্প। ৬২ টি রোমান্টিক পত্রের তৃষিত জলখনি এই কাব্যটি। স্বাভাবিক গতিময়তা নিয়ে প্রেমিকার কাছে লেখা এক একটি পত্র। কবিতা পড়ে আমার যার উদ্দেশে কবিতাগুলো লেখা তাঁকে দেখার ইচ্ছা হচ্ছিল। কিংবা ইচ্ছা হয় যদি আমার প্রেমিকা থাকত তাহলে তাকে শোনাতাম কবিতাগুলো। কিংবা হয়ত শোনাতাম না: কে চায় নিজের আরেকজন প্রতিদ্বন্দ্বী বেড়ে যাক। তার চেয়ে না থেকে বরং ভালো হয়েছে: সিদ্ধান্ত নিতে মস্তিষ্কের এলগরিদমের একটু স্বস্তি হয়েছে। তবুও এই কাব্যের কিছু কথা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলা যায় না। যেমন: শুক্লপক্ষের বৃহদাংশ উজ্জ্বল চাঁদের আকার বলছে পূর্ণিমা আসতে আরও কয়েক সূর্যাস্ত বাকি। কিংবা যখন পড়ি "বুঝি এই পঙ্খিরাজের দোরে এসে ইঁদুরেরও পাখা গজায়"। আর আছে "মেঘদালানের" মতো অসাধারণ কিছু উপমা। 


"ভালোবাসা না ঈশ্বর কে বেশি অনন্ত" এমন সাহসী সুন্দর চিন্তা কেবলি কনফিউজড করে দেয়। তখন দেখি "তোমার নাম চন্দ্রিকা কে রেখেছিল শুনি" এমন বিস্ময়ে গায়ে চাঁদের আলোর মতো প্রেমিকার স্মৃতি জড়িয়ে আছে এক কবি। দুজনে দুজনার মতো পোড়ে বলে "সহমরণে ঝাঁপ দিয়ে" পুড়ে পুড়ে সোনা হতে চাওয়ার নিষ্কলুষ অভিপ্রায়। 


মানুষের কিছু জিজ্ঞাসার উত্তর হয়ত ঈশ্বরও জানে না। যেমন "ওরা বৈধ থেকে মরে স্বর্গে যাবে, নাকি অবৈধ পথে গিয়ে জীবন বাঁচানোর সুযোগ নেবে তা বলে দেয়ার সময় ঈশ্বরের নেই"। আছে সেক্যুলার দ্যোতনা: "পুণ্যের পুরস্কারে স্বর্গ দিও না ঈশ্বর। ফিরিয়ে দিও প্রেয়সীর মর্ত্যে"। স্বর্গের চেয়ে যে মর্ত্য অনেক সুন্দর পুণ্য অর্জন করেও মর্ত্যে থাকার যে বাসনা সেটাই ইহজাগতিকতা। সেটাই সেক্যুলারিজম। 


তবুও তো দুঃখ থাকে। প্রেমিকা হয়ে যায় ব্রহ্মাণ্ডের মতো ভারী। বিষাদ ছাড়িয়ে যায় তিন কোটি নক্ষত্রের" আকাশ।


সব মিলিয়ে অনন্যসুন্দর একটি কাব্যগ্রন্থ "ডাকবাক্সের খোঁজে"। একরাশ মুগধতা নিয়ে এক বসায় শেষ করে ফেলেছি। এখন আফসোস হচ্ছে: এত তাড়াতাড়ি শেষ করা ঠিক হয়নি। আরও বেশি আফসোস হচ্ছে রিভিইউয়ের চিন্তা নিয়ে পড়েছি বলে প্রকৃত আনন্দ থেকে বঞ্চিত হয়েছি। আসলে কবিতা পড়া উচিত ধীরে,  থেমে থেমে। 


যাইহোক, এটা কবির ডেব্যূ ওয়ার্ক সম্ভবত। অভিষেকেই সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে বসে আছেন। আগ্রহী পাঠকেরা পড়ে দেখতে পারেন।

Post a Comment

0 Comments